About
Guidebooks

নির্বাচনে ভুয়া তথ্য, ভোটারদের শঙ্কিত হওয়া জরুরি?

নির্বাচনী ভুয়া তথ্য (Misinformation) এবং অপতথ্যের (Disinformation) বিস্তার বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ণ করছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (World Economic Forum) ২০২৫ সালে ভুয়া তথ্যের বিস্তারকে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো প্রধান স্বল্পমেয়াদী বৈশ্বিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন বা সশস্ত্র সংঘাতের চেয়েও অপতথ্য বৈশ্বিক জিডিপি (GDP), জনসংখ্যা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক অস্ট্রেলিয়া একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, অস্ট্রেলিয়ান জনগণ নির্বাচনী ভুল তথ্যের সম্মুখীন হচ্ছেন এবং এটি নিয়ে তারা চিন্তিত। চলতি ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে যখন নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে ছিল, তখন অস্ট্রেলিয়ায় সাত হাজারের বেশি মানুষের ওপর  জরিপটি পরিচালিত হয়।  

জরিপে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা বলেছেন যে তারা ইতিমধ্যে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর নির্বাচনী তথ্যের সম্মুখীন হয়েছেন। ইচ্ছাকৃত (অপতথ্য বা disinformation) হোক বা অনিচ্ছাকৃত (ভুল তথ্য বা misinformation), আমরা দেখেছি নির্বাচন সংক্রান্ত ছড়ানো বিভিন্ন ধরনের ভুয়া তথ্যের মধ্যে রয়েছে-

 

১. বিভিন্ন নির্বাচনী ইস্যু এবং প্রার্থীদের নিয়ে তথ্য। ২. নির্বাচনী প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি। ৩. নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বা অখণ্ডতা, যেমন ফলাফল পাতানো বা কারচুপির অভিযোগ এবং অস্ট্রেলিয়ান ইলেক্টোরাল কমিশনের ওপর ভিত্তিহীন আক্রমণ।

অস্ট্রেলিয়া এবং আন্তর্জাতিক অন্যান্য ভুল তথ্য সংক্রান্ত গবেষণার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেখা যায়, মানুষ বিভ্রান্ত হওয়ার বিষয়ে স্পষ্টভাবে উদ্বিগ্ন। উত্তরদাতাদের একটি বিশাল অংশ (৯৪%) রাজনৈতিক ভুয়া তথ্যকে সমস্যা হিসেবে দেখেছেন; অর্ধেকেরও বেশি এটিকে “বড়” বা “খুব বড় সমস্যা” হিসেবে গণ্য করেছেন।

 

নানাভাবে ছড়ানো হয় ভুয়া তথ্য

চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আমাদের দল অস্ট্রেলিয়ানরা কী ধরনের নির্বাচনী ভুল তথ্য এবং অপতথ্যের সম্মুখীন হয়েছে তা পর্যবেক্ষণ করেছে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৩.১%) মানুষ নির্বাচনী ইস্যু বা প্রার্থীদের সম্পর্কে মিথ্যা তথ্যের সম্মুখীন হয়েছেন।

ঊনচল্লিশ শতাংশ মানুষ ভোটদান পদ্ধতি সম্পর্কে যেমন কখন এবং কীভাবে ভোট দিতে হবে, সে সম্পর্কে ভুল তথ্য/অপতথ্যের কথা জানিয়েছেন। প্রায় সমপরিমাণ অংশ, ৩৮.৪%, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে ভুয়া বিষয়বস্তু চিহ্নিত করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে নির্বাচন পাতানো বা কারচুপির মিথ্যা দাবি কিংবা অস্ট্রেলিয়ান ইলেক্টোরাল কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যোগসাজশ করছে এমন অভিযোগ।

উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ (২০-৩০%) নিশ্চিত ছিলেন না যে তারা বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়েছেন কিনা। এই অনিশ্চয়তা উদ্বেগজনক। তথ্যের নির্ভুলতা বিচার করতে না পারার বিষয়টি সঠিক মতামতের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।

এটি অন্যান্য গবেষণার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ যা দেখায় যে অনেক অস্ট্রেলিয়ান মনে করেন অনলাইনে তথ্য যাচাই করার মতো তাদের যথেষ্ট দক্ষতা নেই।

অস্ট্রেলিয়া নির্বাচনের প্রধান ইস্যুগুলো নিয়ে ভুল তথ্য/অপতথ্যের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণগুলো হলো: ১. মেডিকেয়ার ২. পারমাণবিক শক্তি ৩. আবাসন ৪. জীবনযাত্রার ব্যয় ৫. জলবায়ু

 

বিভ্রান্তিকর তথ্যের সাথে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে নামগুলোকে যুক্ত করেছেন সেগুলো হলো:

ডোনাল্ড ট্রাম্প, ক্লাইভ পামার, লেবার পার্টি, লিবারেল পার্টি, ফেসবুক।

 

নির্বাচনী প্রচারণায় ভুল তথ্য এবং অপতথ্যের এই স্ব-প্রতিবেদিত দাবিগুলোর প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য আরও গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন। তবে, আমরা জানি যে যারা মিথ্যা বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে এসেছেন, তারা মূলধারার দৈনিক সংবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়া—উভয় উৎস থেকেই এটি চিহ্নিত করেছেন।

 

আমাদের কি শঙ্কিত হওয়া উচিত?

মনোবিজ্ঞান, যোগাযোগ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান ক্ষেত্রের গবেষণা দেখায় যে, তথ্যের সম্মুখীন হওয়া (exposure) এবং তার প্রভাব (impact) এক বিষয় নয়। তবুও, ভুয়া তথ্য এবং অপতথ্য দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মনোভাব এবং আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।

২০২৩ সালের ‘ভয়েস গণভোট’ (Voice referendum) নিয়ে আমরা পেয়েছি, অস্ট্রেলিয়ান ইলেক্টোরাল কমিশনকে লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্য জনগণের আস্থার ওপর ছোট কিন্তু লক্ষণীয় প্রভাব ফেলেছিল, যদিও সামগ্রিকভাবে আস্থা বেশিই ছিল।

আরেকটি বৈশ্বিক গবেষণায় আমরা দেখেছি, অনলাইন অপতথ্য নির্বাচনের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা পাল্টে দিতে পারে।

 

মিথ্যার বিরুদ্ধে লড়াই

জরিপে ৮৯% বলেছেন যে, ভুয়া তথ্য কীভাবে শনাক্ত করা যায় সেটা জানা দরকারী। ৬৯% মনে করেন যে মিথ্যা তথ্য তাদের ব্যক্তিগতভাবে প্রভাবিত করেছে। বিশেষত অনেকে নির্বাচনের সময় প্রার্থী কিংবা নির্বাচনী সমস্যা নিয়ে ভুয়া তথ্য নিয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বা অসহায় মনে করেন।

অপতথ্য মোকাবিলায় AEC বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ভাবনী নির্বাচনী কর্তৃপক্ষগুলোর মধ্যে অন্যতম। আরেকটি অপ্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ট্রেলিয়ান নির্বাচন কমিশন (AEC) ভুল তথ্য মোকাবিলায় তিনটি কৌশল বৈশ্বিক রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত।

প্রথমত, তারা ‘পাবলিক ডিজইনফরমেশন রেজিস্টার’ চালু করেছে, যেখানে নির্বাচন সম্পর্কে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা দাবিগুলো চিহ্নিত করে তার বিপরীতে সঠিক তথ্য ও ব্যাখ্যা প্রকাশ করে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।

 দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে ‘মিডিয়া পার্টনারশিপ’ বা সহযোগিতার মাধ্যমে তারা দ্রুত ভুল তথ্য শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করে। তারা বড় বড় টেক কোম্পানি ও মিডিয়ার সাথে জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করে। এর মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করে যেন ভুল তথ্য দ্রুত সরিয়ে ফেলা হয় অথবা সঠিক তথ্যটি ব্যবহারকারীদের টাইমলাইনে বেশি গুরুত্ব পায়।

তৃতীয়ত, তাদের ‘স্টপ অ্যান্ড কনসিডার’ ক্যাম্পেইন ভোটারদের সচেতন করে যেন তারা কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে চিন্তা করেন এবং এর সত্যতা যাচাই করে তবেই সিদ্ধান্ত নেন। এই তিনটি পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও ভোটারদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

আমাদের নিজস্ব গবেষণায় আরও কিছু আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা গেছে। যারা অস্ট্রেলিয়ান গণতন্ত্র নিয়ে বেশি সন্তুষ্ট, তারা অসন্তুষ্টদের তুলনায় অপতথ্যকে কম হুমকি হিসেবে মনে করেন। ফলে গণতন্ত্রের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

নির্বাচনে যেই জিতুক না কেন, নির্বাচনী ভুল তথ্য এবং অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা সকলের গণতান্ত্রিক স্বার্থের অন্তর্ভুক্ত। 

 

 

দ্য কনভারসেশন থেকে অনূদিত

আরো পড়ুন