About
Guidebooks

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবসার মূলে যখন ‘অপতথ্য’: কী বলছে গবেষণা?

অনলাইনে প্রতারণামূলক কন্টেন্ট এখন বিশাল এক ব্যবসা। ৬২৫ বিলিয়ন ইউরোর ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারে মূল মন্ত্র একটাই, যত বেশি ‘ক্লিক’ ও ‘ভিউ’, তত বেশি টাকা। সত্য হোক বা মিথ্যা, উসকানিমূলক ও চমকপ্রদ খবর খুব সহজেই আমাদের নজর কাড়ে। আর এই সুযোগে বিজ্ঞাপনদাতারা অজান্তেই ভুয়া খবর (Fake News) ও বিদ্বেষমূলক প্রচারে অর্থায়ন করে ফেলেন।

এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো খুব ভালো করেই জানে যে অপতথ্য ছড়ালে তাদের মুনাফা বাড়ে। রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে সমাজকে বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করাই এসবের উদ্দেশ্য। গবেষণা বলছে, অপতথ্য বিদ্যমান বাজারব্যবস্থার কোনো অপ্রত্যাশিত ফল নয়, বরং এটি এই মডেলেরই একটি স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত পরিণতি।

এনগেজমেন্ট বাড়ে যেভাবে

সোশ্যাল মিডিয়া মূলত তথ্যের জন্য নয়, বিনোদনের জন্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেছে, রাগ বা উদ্বেগের মতো নেতিবাচক আবেগ কিংবা বিস্ময়কর কন্টেন্ট দ্রুত ভাইরাল হয়। প্ল্যাটফর্মগুলো এই মনস্তত্ত্বকে তাদের ব্যবসায়িক মডেলে কাজে লাগিয়েছে। তারা আমাদের বিনামূল্যে ‘ইনফোটেইনমেন্ট’ (তথ্য ও বিনোদন) দেয় আর বিনিময়ে হাতিয়ে নেয় আমাদের ডেটা। এই ডেটা বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞাপনদাতারা আমাদের টার্গেট করেন।

টাকার খেলা ও ইনফ্লুয়েন্সার

অনলাইনে এনগেজমেন্ট বা সাড়া বাড়াতে পারলেই টাকা। তাই সত্য-মিথ্যে যা-ই হোক, ক্লিক ও কমেন্ট পাওয়া কন্টেন্টই এখানে দামী। উসকানিমূলক ও বিতর্কিত কন্টেন্ট ছড়িয়ে ইনফ্লুয়েন্সাররা ধনী হচ্ছেন আর তাদের দেখে অন্যরাও একই পথ বেছে নিচ্ছেন। এমনকি গণতন্ত্রবিরোধী কন্টেন্ট প্রচার করতেও তারা পিছপা হন না। বিদ্বেষ ছড়ানোর দায়ে কোনো ইনফ্লুয়েন্সার নিষিদ্ধ হলেও প্ল্যাটফর্মের ক্ষতি নেই, কারণ বিজ্ঞাপনের টাকা তাদের পকেটেই থাকে।

ডিজিটাল মার্কেটিং ও দায়বদ্ধতা

ব্র্যান্ডগুলো সাধারণত ‘অ্যাড টেক’ (Ad Tech) ফার্মের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়, যাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। ফলে ব্র্যান্ডগুলো অজান্তেই রাশিয়া-ইউক্রেন বা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধের মতো ঘটনায় অপপ্রচারে অর্থায়ন করে ফেলে। প্রমাণ পাওয়ার পরও ব্র্যান্ডগুলো নীরব থাকে, যা তাদেরও অপরাধী করে তোলে।

সমাধান কোন পথে?

কেবল কন্টেন্ট মডারেশন বা ফ্যাক্ট-চেকিং যথেষ্ট নয়, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারেই সংস্কার আনা প্রয়োজন। ব্র্যান্ড ম্যানেজাররা তাদের বিজ্ঞাপনের বাজেট ব্যবহার করে প্ল্যাটফর্মগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারেন যেমনটা ইলন মাস্কের বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের পর ‘এক্স’-এর (সাবেক টুইটার) ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বয়কটের মাধ্যমে দেখা গেছে।

২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে ইলন মাস্ক ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে একটি ইহুদিবিদ্বেষী (antisemitic) ষড়যন্ত্র তত্ত্বে সমর্থন জানিয়ে একটি পোস্ট করেছিলেন। তিনি একটি বিদ্বেষমূলক পোস্টের নিচে লিখেছিলেন যে, সেটিই “আসল সত্য”।

 

মাস্কের এই কান্ডের পর ডিজনি (Disney), অ্যাপল (Apple), আইবিএম (IBM) এবং ওয়ার্নার ব্রাদার্সের মতো বিশ্বের বিশাল সব কোম্পানি এক্সে তাদের বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ (Boycott) করে দেয়। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা এমন কোনো প্ল্যাটফর্মে টাকা খরচ করতে চায় না যেখানে বিদ্বেষমূলক কথাবার্তাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়।

সবশেষে, টেক জায়ান্টদের মুনাফা যাতে আমাদের গণতন্ত্রের বিনিময়ে না আসে, তা নিশ্চিত করতে নীতিনির্ধারকদেরই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

 —

লেখক: কার্লোস ডিয়াজ রুইজ (সহকারী অধ্যাপক, হ্যাঙ্কেন স্কুল অফ ইকোনমিক্স); দ্য কনভারসেশন থেকে অনূদিত

 

আরো পড়ুন