আমাদের প্রতিদিনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ডিভাইসগুলোর একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন। এর ভেতরে আছে ছবি, মেসেজ, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যাংকিং অ্যাপ, এমনকি আমাদের নিত্যদিনের জরুরি কাজের ডকুমেন্টও। এই ফোনটাই অসাবধানতার কারণে ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিন্তু ভালো খবর হলো, কিছু সহজ সেটিংস আর অভ্যাস বদলালেই ফোনকে অনেকটাই নিরাপদ রাখা যায়। নিচের ১১টি ধাপ ধীরে ধীরে অনুসরণ করলে আপনার অ্যান্ড্রয়েড ফোনের প্রাইভেসি অনেক বেশি সুরক্ষিত হবে।
১. টু-ফ্যাক্টর অথবা মাল্টি ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন (2FA) চালু রাখুন
শুধু পাসওয়ার্ড দিয়ে গুগল বা অন্য অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত রাখা এখন আর যথেষ্ট নয়। টু-ফ্যাক্টর অথবা মাল্টি ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু করলে লগইন করার সময় পাসওয়ার্ডের পাশাপাশি আরেকটি কোড বা কনফার্মেশন লাগে, যা সাধারণত আপনার ফোনে আসে। এতে কেউ পাসওয়ার্ড জেনেও সরাসরি অ্যাকাউন্টে ঢুকতে পারে না। গুগল অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক, ইমেইল; যেখানে যেখানে এই অথেনটিকেশনের সুযোগ আছে, সবগুলোতেই এই অপশন চালু করে রাখুন।
২. শক্তিশালী পাসকোড ব্যবহার করুন
ফোন আনলক করার জন্য ৪ ডিজিটের খুব সহজ পিন বা “১২৩৪” টাইপ কোড ব্যবহার করা মোটেই নিরাপদ না। চেষ্টা করুন কম্বিনেশন পিন (৬ ডিজিট বা তার বেশি), প্যাটার্ন লক বা শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে। আশেপাশের লোকজন সহজে দেখে মুখস্থ করতে পারে এমন প্যাটার্ন ব্যবহার করবেন না, যেমন সোজা লাইন বা গোল ঘুরানো প্যাটার্ন। যদি মনে করেন ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা ফেস আইডি জোর করে দিয়ে ফোন খুলে নেওয়ার ঝুঁকি আছে, তাহলে প্রয়োজন হলে এগুলো বন্ধ রেখে শুধু পিন/পাসওয়ার্ড ব্যবহার করতে পারেন।
৩. কোন অ্যাপ কী এক্সেস নিচ্ছে, নিয়মিত যাচাই করুন
নতুন অ্যাপ ইনস্টল করার সময় অনেকেই না ভেবেই “Allow” চাপ দিয়ে দেন, ফলে অ্যাপটি ক্যামেরা, মাইক, লোকেশন, কনট্যাক্টস সবকিছুরই অনুমতি পেয়ে যায়। সব অ্যাপের এই সব অনুমতি আসলে একদমই দরকার হয় না। ফোনের Settings > Apps বা Privacy সেকশন থেকে দেখে নিন কোন অ্যাপ কী কী অনুমতি পেয়েছে। যে পারমিশন অপ্রয়োজনীয়, যেমন সিম্পল গেম অ্যাপ লোকেশন বা কনট্যাক্ট চাইছে, সেগুলো সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দিন।
৪. ফোন ও অ্যাপের অটো আপডেট চালু রাখুন
অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেম আপডেট আর অ্যাপ আপডেটের ভিতরে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা প্যাচ থাকে। এগুলো ইনস্টল না করলে পুরনো দুর্বলতা (vulnerability) ব্যবহার করে হ্যাকাররা আপনার ডিভাইসে আক্রমণ করতে পারে। তাই Play Store–এ গিয়ে অ্যাপের জন্য Auto-update চালু রাখুন এবং ফোনের Settings থেকে সিস্টেম আপডেট চেক করে রাখুন। চাইলে ঠিক করে দিতে পারেন যেন শুধু Wi‑Fi তে কানেক্টেড থাকলে আপডেট ডাউনলোড হয়, এতে ডেটাও বাঁচবে আবার আপডেটও হবে।
৫. Find My Device অপশন চালু রাখুন
ফোন হারিয়ে গেলে বা চুরি হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভেতরের ডেটা। গুগলের Find My Device অপশন চালু থাকলে আপনি অন্য কোনো ডিভাইস থেকে ফোনের লোকেশন দেখতে পারেন, প্রয়োজনে ফোনে রিং দিতে পারেন, এমনকি দূর থেকে পুরো ডেটা মুছে ফেলারও ব্যবস্থা আছে। এজন্য গুগল অ্যাকাউন্টে লগইন করে “Find My Device” সক্রিয় আছে কি না দেখে নিন। এই ছোট্ট সেটিংটাই বিপদের সময় অনেক বড় সুরক্ষা দিতে পারে।
৬. লক স্ক্রিনে ব্যক্তিগত নোটিফিকেশন বন্ধ করুন
ফোন লক থাকা অবস্থাতেও অনেক সময় মেসেজ, ওটিপি, ইমেইলের প্রিভিউ লক স্ক্রিনে দেখায়। এতে ফোন হাতে নিয়ে কেউ না খুলেই অনেক তথ্য পড়ে ফেলতে পারে, যা একদমই কাম্য নয়। Settings থেকে Lock Screen বা Notifications–এ গিয়ে ঠিক করে দিন। যেন ব্যক্তিগত কনটেন্ট লুকিয়ে রাখা হয় বা শুধু অ্যাপের নাম দেখায়, মেসেজের ভেতরের অংশ না। এতে ফোন আপনার কাছেই না থাকলে অন্তত লক স্ক্রিন থেকে কেউ গোপন তথ্য জেনে ফেলতে পারবে না।
৭. পারসোনালাইজড বিজ্ঞাপন অপশন বন্ধ করুন
অনেক অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইসে “Ads personalization” বা অনুরূপ অপশন থাকে, যা আপনার ব্যবহার অভ্যাস দেখে টার্গেটেড অ্যাড দেখায়। এতে আপনার আগ্রহ, সার্চ হিস্ট্রি, লোকেশন ইত্যাদি নিয়ে বেশ শক্তিশালী প্রোফাইল তৈরি করা যায়। চাইলে Settings > Google > Ads (বা Privacy) থেকে পারসোনালাইজড বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিতে পারেন। এতে হয়তো বিজ্ঞাপন পুরোপুরি বন্ধ হবে না, কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্যের ভিত্তিতে ট্র্যাকিং অনেকটাই কমে যাবে।
৮. গুগল অ্যাকাউন্টে প্রাইভেসি চেকআপ করুন
গুগল আপনার লোকেশন হিস্ট্রি, ইউটিউব হিস্ট্রি, সার্চ হিস্ট্রি – অনেক কিছুই সেভ করে রাখে, যেগুলো আপনি চাইলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। গুগলের Privacy Checkup বা Account Settings–এ গিয়ে দেখে নিন কোন কোন ডাটা সেভ হচ্ছে এবং কোন কোন কার্যকলাপ ট্র্যাক করা হচ্ছে। চাইলে লোকেশন হিস্ট্রি বা ওয়েব ও অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি বন্ধ বা অটো-ডিলিট করে দিতে পারেন। কয়েক মিনিট সময় দিলেই আপনার গুগল প্রোফাইল অনেক কম উন্মুক্ত থাকবে।
৯. ক্যামেরা ও মাইকের অ্যাক্সেস দ্রুত বন্ধ করার শর্টকাট ব্যবহার করুন
নতুন অ্যান্ড্রয়েড ভার্সনগুলোতে স্ট্যাটাস বার বা কুইক সেটিংসে ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন দ্রুত বন্ধ করার টগল থাকে। সন্দেহ হলে বা অচেনা অ্যাপ ব্যবহার করার সময় চাইলে এক ট্যাপে ক্যামেরা/মাইক অফ করে নিতে পারেন। এতে কোনো অ্যাপ অনুমতি পেলেও আসলে ক্যামেরা বা মাইক ব্যবহার করতে পারবে না। এই টগলগুলো কুইক প্যানেলে আগে থেকে সাজিয়ে রাখলে প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবহার করতে পারবেন।
১০. ক্লিপবোর্ডে কী কপি করছেন, খেয়াল রাখুন
আমরা প্রায়ই পাসওয়ার্ড, ওটিপি, কার্ড নম্বর বা সংবেদনশীল তথ্য কপি–পেস্ট করি, যা কিছু সময়ের জন্য ফোনের ক্লিপবোর্ডে সেভ থাকে। কিছু অ্যাপ ক্লিপবোর্ডে কী আছে, তা পড়তে পারে, আর সেখান থেকে আপনার গোপন তথ্য চলে যেতে পারে। তাই চেষ্টা করুন গোপন তথ্য কপি–পেস্ট না করতে, খুবই দরকার হলে কাজ শেষে অন্য কিছু কপি করে ক্লিপবোর্ড “ওভাররাইট” করে দিন। অনেক অ্যান্ড্রয়েডে ক্লিপবোর্ড অটো–ক্লিয়ার করার অপশনও থাকে, সেগুলো থাকলে চালু করে দিন।
১১. মেসেজিং অ্যাপে End-to-End এনক্রিপশন ব্যবহার করুন
আপনার মেসেজ যদি মাঝপথে কেউ পড়তে পারে, তাহলে কোনো প্রাইভেসি থাকে না। End-to-End এনক্রিপশন থাকলে মেসেজ শুধু প্রেরক আর প্রাপকই পড়তে পারে, মাঝখানে কেউ চাইলে সেটি সহজে ডিক্রিপ্ট করতে পারে না। WhatsApp, Signal, অনেক মেসেজিং অ্যাপেই এই সুবিধা ডিফল্ট অন থাকে বা সেটিংস থেকে চালু করা যায়। যে অ্যাপই ব্যবহার করুন না কেন, দেখে নিন সেখানে এনক্রিপশন অন আছে কি না, না থাকলে প্রাইভেসি–ফোকাসড অ্যাপে ধীরে ধীরে স্যুইচ করার কথা ভাবতে পারেন।