About
Guidebooks

‘ডেটা’ যখন নির্বাচনী জয়ের হাতিয়ার

‘বট’ যেভাবে ব্রাজিলের নির্বাচনে বিভেদ উস্কে দিয়েছিল

আপনি কি জানেন কোনো রাজনৈতিক প্রচারে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে কি না? আপনি কি নির্বাচনের কোনো কন্টেন্ট পেয়েছেন বা আপনাকে কি কোনো প্রার্থীর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত করা হয়েছে? নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে কি আপনার ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রাম ভেসে যাচ্ছে?

বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ট্যাকটিক্যাল টেকনোলজি কালেকটিভ’-এর বৈশ্বিক প্রকল্পের অংশ হিসেবে ‘কোডিং রাইটস’-এর একটি গবেষণায় ২০১৮ সালে ব্রাজিলের জাতীয় নির্বাচনে দেখা যায়, নির্বাচনে ‘পার্সোনাল ডেটা’ বা ব্যক্তিগত তথ্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছে। 

গবেষণায় রাজনৈতিক মার্কেটিং বা প্রচারণার কৌশলে ব্যক্তিগত ডেটার ভূমিকা অনুসন্ধান করে। এটির ফলাফল “Personal data and political influence in preparation for the Brazilian elections of 2018” শীর্ষক রিপোর্টে বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে। এতে ‘ইনফ্লুয়েন্স ইন্ডাস্ট্রির’ কৌশলগুলো খতিয়ে দেখা হয়। 

২০১৮ সালের নির্বাচনটি ছিল ব্রাজিলের ইতিহাসে প্রথম, যেখানে নির্বাচনী প্রচারণায়  ইন্টারনেটে স্পনসর করার অনুমতি দেওয়া হয়, এরমধ্যে সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। টিভি ও রেডিওতে প্রচারের সময়সীমা কমে যাওয়ায় এবং ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০১৮ সালের ব্রাজিলের নির্বাচনী মার্কেটিংয়ের প্রধান রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে ওয়েব জগত। 

ব্রাজিলে ২০১৪ সালের নির্বাচনেও সামাজিক মাধ্যমগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। ফেসবুকের তথ্যমতে, মাত্র সাড়ে তিন মাসের প্রচারণায় ৬৭ কোটি ৪৪ লাখ ইন্টারঅ্যাকশন (প্রতিদিন গড়ে ৫৯ লাখ ৬০ হাজার) হয়েছিল, যা ফেসবুকে কোনো নির্বাচন নিয়ে আলোচনার সর্বকালের রেকর্ড। এর আগের রেকর্ডটি ছিল ভারতের (প্রতিদিন ৩২ লাখ ৮০ হাজার)। টুইটারেও প্রচারণার সময় ৩ কোটি ৯৮ লাখ ৫০ হাজার বার্তা পোস্ট করা হয়েছিল।   

২০১৪ সালের ব্রাজিলের নির্বাচনে ‘বট’ (Bots) ব্যবহার করে দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর মধ্যে অনলাইনে তুমুল রেষারেষি তৈরি করা হয়েছিল। প্রার্থীরা প্রচারণার জন্য দুটি হ্যাশট্যাগ বা স্লোগান ব্যবহার করেন। একটি হলো #Aecio45PeloBrasil, যার অর্থ ‘ব্রাজিলের জন্য এইসিও’ (এইসিও ছিলেন বিরোধী প্রার্থী এবং ৪৫ ছিল তাঁর ব্যালট নম্বর)। অন্যটি হলো #DilmaMudaMais, অর্থাৎ ‘দিলমা আরও পরিবর্তন আনবেন’ (দিলমা ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট)।

 

বট ব্যবহার করে এই দুটি স্লোগান সোশ্যাল মিডিয়ায় কোটি কোটি বার শেয়ার করা হয়। এতে সাধারণ মানুষের মনে হয় যে, পুরো দেশ বুঝি এই দুই ভাগে ভাগ হয়ে লড়াই করছে। ইন্টারনেটে এই কৃত্রিম ঝগড়া এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে, ব্রাজিলের নির্বাচন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বা ‘ট্রেন্ডিং টপিক’-এ পরিণত হয়। অন্যদিকে দেশের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদ বা দূরত্ব আরও বেড়ে যায়।

২০১৫ সালে ব্রাজিলের ফেডারেল সুপ্রিম কোর্ট (STF) নির্বাচনী প্রচারণায় কর্পোরেট অনুদানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। ফলে ২০১৮ সালের নির্বাচনটি ছিল প্রথম নির্বাচন যেখানে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের প্রচারণায় বেসরকারি কোম্পানি থেকে কোনো ধরণের আর্থিক সহায়তা নেওয়া নিষিদ্ধ ছিল। তবে আইনের অন্যান্য পরিবর্তনের ফলে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং জোটগুলোকে ব্লগ, ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং সাইট এবং ইন্টারনেটের অনুরূপ অ্যাপগুলোতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

কেউ হয়তো ভাবতে পারে, “এতে সমস্যাটা কোথায়?” ভোটাররা তো আগে থেকেই টিভি এবং ওয়েবের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছেন। কিন্তু সোশ্যাল নেটওয়ার্কে কন্টেন্ট প্রমোট করা, নির্দিষ্ট অ্যাড টার্গেটিং প্র্যাকটিস এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনকে আরও নিখুঁত করতে ব্যক্তিগত ডেটার ব্যবহার ভোটারদের আরও বেশি করে ‘টার্গেট’ বানিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে, এর ফলে তারা হয়তো তথ্যের অবাধ প্রবাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই কলকাঠি কীভাবে নাড়ানো হয় তা বুঝতে আমাদের গবেষণায় ডিজিটাল ক্যাম্পেইন স্ট্র্যাটেজিস্ট বা কৌশলবিদদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

তাঁদের উত্তর থেকে জানা গেছে যে, ডেটা ইন্ডাস্ট্রিগুলো সরকারি উৎস এবং বড় বড় টেলিকমিউনিকেশন ও ক্রেডিট স্কোর কোম্পানিসহ সব জায়গা থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে তা একত্রিত করে।

ডেটা ব্রোকার এবং বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর এই বিশাল শিল্পের ব্যবসায়িক মডেলই দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব এবং অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত ডেটা বেচাকেনার ওপর। এই সব ডেটা যার মধ্যে ভোটারদের বিস্তারিত তথ্য যেমন হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর এবং আর্থসামাজিক অবস্থান ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে এজেন্সিগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য তাদের যোগাযোগের কৌশল তৈরি করে।

ব্রাজিলে ডিজিটাল রাজনৈতিক প্রচারণায় ডেটা সংগ্রহের পদ্ধতি এবং কৌশলগুলোতে একটি বড় অসামঞ্জস্য বা ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। এই ঘটনাটি আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন—শুধু নির্বাচনের সময় নয়, নির্বাচনের পরেও। কারণ নাগরিকদের ডেটার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা এই যোগাযোগ ব্যবস্থাটি ইতিমধ্যেই উগ্র ডানপন্থী সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সম্ভবত মানুষের মৌলিক মানবাধিকারের জন্য ক্ষতিকর।

 

–মিডিয়াম ডটকমে কোডিং রাইটসের একটি প্রতিবেদন থেকে

আরো পড়ুন