About
Guidebooks

ডিজিটাল স্বাধীনতার লড়াই জারি রাখতে যা জানা জরুরি

ইন্টারনেট আজ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে স্বাধীনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কম, আর এআই সেই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।  জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে অনলাইনে কথোপকথনকে বদলে দিচ্ছে, মত প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে, এমনকি সেন্সরশিপকে স্বয়ংক্রিয় করে ফেলছে। ফ্রিডম হাউসের সাম্প্রতিক রিপোর্ট দেখায়, অন্তত ১৬টি দেশে যার মধ্যে পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র আছে, রাজনৈতিক কর্তাব্যক্তিরা গত এক বছরে এআই ব্যবহার করে ইন্টারনেট আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মতের কারণে ওয়েবসাইট ব্লক করার ঘটনা বেড়েছে, আর অনলাইন প্রকাশের জন্য মানুষের গ্রেপ্তারও রেকর্ড সংখ্যায় পৌঁছেছে।

এআই ও ইন্টারনেট স্বাধীনতার সংকট

ফ্রিডম হাউসের বার্ষিক রিপোর্ট দীর্ঘদিন ধরে ডিজিটাল স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করছে। এ বছরের রিপোর্ট স্পষ্ট করে বলছে, জেনারেটিভ এআই এখন ভূরাজনীতিতে নিয়ম বদলে দেওয়া এক বড় শক্তি। শুধু প্রোপাগান্ডা ছড়ানো নয়, বরং অনলাইনে বিরোধী মত চাপা দেওয়া, সমালোচনামূলক কণ্ঠকে দুর্বল করা, আর ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। চীনের উদাহরণ খুব স্পষ্ট: সেখানে জেনারেটিভ এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টকে সরকারি দল কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে থাকতে হবে, এটা নিয়ম, বিকল্প না। এমন নিয়ম শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে হত্যা করে না, বরং পুরো ডিজিটাল তথ্য-বাস্তবতাকেই একদলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বন্দি করে ফেলে। আমাদের কাছে এটা খুব পরিষ্কার যে, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নয়; যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা সেটাকে নিজেদের স্বার্থে ঢেলে সাজায়।

এআই মডেলের স্বচ্ছতাই হবে প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর

এই প্রেক্ষাপটে এআই মডেলের স্বচ্ছতা বাড়ানোকে আমরা প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর মনে করি। বড় ভাষা মডেল, যেমন চ্যাটজিপিটি, সাধারণ মানুষের কাছে একেবারেই ব্ল্যাক বক্সের মতো। আমরা জানি না কোন ডেটা দিয়ে এগুলোকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কী ধরনের পক্ষপাত আগে থেকেই এর ভেতরে বসানো আছে, আর কে কনটেন্ট দেখাবে, আর কে দেখাবে না, সে সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে। ফ্রিডম হাউসের সুপারিশ খুব সরল: সরকার যদি কিছু করে, তা যেন স্বচ্ছতা বাড়ায়, জনসাধারণের নজরদারির ব্যবস্থা শক্তিশালী করে, আর মানবাধিকারের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়।

আমার মনে হয়, বড় ও জটিল সর্বজনীন আইন সব দেশে একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা এখনই হয়তো সম্ভব না, কিন্তু ছোট ছোট নির্দিষ্ট নিয়ম করা একেবারে সম্ভব। যেমন, প্রশিক্ষণ ডেটার ধরন ও উৎস প্রকাশের বাধ্যবাধকতা, আউটপুটে পক্ষপাত আছে কি না তা নিয়মিত পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ করা, নির্বাচন বা রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে এআই মডেল কী ধরনের উত্তর দিতে পারবে সে বিষয়ে স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করা ইত্যাদি। এসব স্বচ্ছতা কেবল গবেষক বা কর্মীদের জন্য নয়, সাধারণ নাগরিকের জন্যও জরুরি, যাতে তারা অন্তত বুঝতে পারে, কোনো কনটেন্ট সরকারের পক্ষে তৈরি কি না, বা কোনো রাষ্ট্র-সমর্থিত প্রচার কিনা।

“নিরাপত্তা”র অজুহাতে সেন্সরশিপ

সোশাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো এখন স্বয়ংক্রিয় কনটেন্ট মডারেশন ছাড়া নিজেদের কল্পনাই করতে পারে না। তারা বলে, এটা ভুয়া তথ্য, ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও সহিংসতা ঠেকাতে প্রয়োজন। আংশিকভাবে এটা ঠিকও বটে। কিন্তু সেন্টার ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড টেকনোলজির ম্যালোরি নোডেল যে সতর্কতা দিয়েছেন, আমি সেটার সঙ্গে একমত, এআই-নির্ভর মডারেশন খুব সহজেই বাকস্বাধীনতার বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

যখন সরকার প্ল্যাটফর্মগুলোকে আইনের মাধ্যমে বাধ্য করে কনটেন্ট স্ক্যান ও ফিল্টার করতে, তখন কোম্পানিগুলো সাধারণত “সেফ সাইডে” থাকতে গিয়ে অতিরিক্ত ব্লক করা শুরু করে। অ্যালগরিদম ভুল করলেই তো কেউ তাকে জেলে পাঠাবে না, কিন্তু কম ব্লক করে “অপরাধীকে” ছেড়ে দিলে রাজনৈতিক চাপ আসতে পারে—এই ভয়ে বাড়তি সেন্সরশিপ চলে আসে। এর ফল কী জানেন? নিরাপত্তার নামে ভিন্ন মত, সংখ্যালঘু কণ্ঠ, বা সরকারের সমালোচনামূলক বক্তব্য ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যেতে থাকে।

নোডেল যে “হিউমান-ইন-দ্য-লুপ” ধারণার কথা বলেছেন, আমার মতে সেটাই বাস্তবসম্মত পথ। পুরো সিস্টেমকে অ্যালগরিদমের হাতে ছেড়ে না দিয়ে প্রশিক্ষিত মানুষের বিচারকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। পাশাপাশি “ইউজার এজেন্সি” বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যবহারকারীদের সহজ ও কার্যকর টুল দিতে হবে, যাতে তারা নিজেরাই ভুয়া তথ্য ব্লক ও রিপোর্ট করতে পারে। ব্যবহারকারীকে শুধু ভোক্তা না ভেবে সহ-নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এআই-তৈরি কনটেন্ট লেবেলিং: নির্বাচনের আগে সময়ের দাবি

এখন এআই দিয়ে তৈরি ছবি, অডিও, ভিডিওকে চিহ্নিত করা প্রযুক্তিগতভাবে খুব কঠিন। কোনও বিশ্ব-স্বীকৃত মান নেই, ফলে কোন কনটেন্ট আসল আর কোনটা এআই-তৈরি—এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নির্বাচন সামনে থাকলে এই ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

ফ্রিডম হাউসের গবেষক অ্যালি ফাঙ্ক নাইজেরিয়ার যে উদাহরণটি দিয়েছেন, সেটা আমার কাছে খুবই উদ্বেগজনক। সেখানে একটি এআই-ম্যানিপুলেটেড অডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী আতিকু আবুবাকার আর তার দল নাকি ভোট জালিয়াতি নিয়ে কথা বলছেন। একটি দেশে যদি আগেই নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা ও অবিশ্বাসের ইতিহাস থাকে, তাহলে এমন একটি অডিও আগুনের দিকে তেল ঢালার মতো কাজ করে। মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে, ক্ষোভ বেড়ে যায়, আর সামান্য উস্কানিতে তা সহিংসতায় রূপ নেয়।

এআই-তৈরি অডিও শনাক্ত করা যে বিশেষভাবে কঠিন, তা গবেষকরাই বলছেন। এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ দেখাচ্ছে, আমাদের বিভিন্ন স্তরে লেবেলিং ব্যবস্থা দরকার। কখনও সোর্স-লেভেলে, কখনও প্ল্যাটফর্ম-লেভেলে, আবার কখনও ব্যবহারকারীর ইন্টারফেসেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিতে হবে যে এটি ম্যানিপুলেটেড বা এআই-তৈরি কনটেন্ট। হয়তো আগামী বছরের সব নির্বাচনের আগে সম্পূর্ণ নিখুঁত সমাধান তৈরি করা সম্ভব হবে না, কিন্তু কাজটি এখনই শুরু না করলে পরে অনেক দেরি হয়ে যাবে।

শেষ কথা

সব তথ্য একসঙ্গে দেখলে ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার মনে হতে পারে: ইন্টারনেট স্বাধীনতা কমছে, গ্রেপ্তার বাড়ছে, সেন্সরশিপ আরও স্মার্ট ও স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে, আর এআই এই পুরো প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করছে। তবু আমরা পুরোপুরি হতাশ নই, কারণ কিছু বাস্তব পদক্ষেপ এখনই সম্ভব। এআই মডেলের স্বচ্ছতা বাড়ানো, মানবাধিকার-কেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা, কনটেন্ট মডারেশনে মানুষের ভূমিকা বজায় রাখা, ব্যবহারকারীর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং এআই-তৈরি কনটেন্টের জন্য শক্তিশালী লেবেলিং ব্যবস্থা তৈরি; এসব কোনো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়, বাস্তব নীতি-নির্ধারণের বিষয়।

আমাদের দৃষ্টিতে মূল প্রশ্ন একটাই: আমরা কি প্রযুক্তিকে কেবল ক্ষমতাবানদের হাতের অস্ত্র হতে দেব, নাকি নাগরিকদের অধিকার রক্ষার হাতিয়ার বানাতে চেষ্টা করব? ইন্টারনেটকে আরও নিরাপদ ও আরও স্বাধীন রেখে এআই ব্যবহার করা খুব কঠিন কাজ বটে, কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি আমরা এখনই শুরু করি, আর সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে মানবাধিকারকে সামনে রাখি, পেছনে নয়।

আরো পড়ুন