ইন্টারনেটে আমরা বন্ধু খুঁজি, খবর দেখি, ছবি–ভিডিও শেয়ার করি। কিন্তু এই সুবিধার পাশাপাশি অনেকের জন্য সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠছে ভয় আর অস্বস্তির জায়গা; বিশেষ করে নারী ও বিভিন্ন জাতিগত পরিচয়ের মানুষের জন্য। তাই আলোচনা দরকার, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে সমস্যা কোথায়, আর কোন জায়গাগুলোতে দ্রুত পরিবর্তন দেখা উচিত।
ঘৃণা–বিদ্বেষ ঠেকাতে ব্যর্থতা
ফেসবুকে নারীবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, ট্রান্সফোবিয়া, ডেডনেমিং বা মিসজেন্ডারিংয়ের মতো আচরণ অনেক সময়েই ঠেকানো যায় না। একজন মানুষ একই সঙ্গে নারী, ট্রান্স কিংবা কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ায় একাধিকভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারেন, তবু প্ল্যাটফর্মটি তা যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয় না। এতে অনলাইনে নিরাপত্তাবোধ কমে যায়, ভুক্তভোগীরা হয়ে পড়েন একা।
নীতি আছে, প্রয়োগ নেই
ফেসবুকের নিজস্ব নীতিমালা(কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড) থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগে বড় ঘাটতি দেখা যায়। আপত্তিকর পোস্ট সরাতে গড়িমসি হয়, অনেক সময় সরানোই হয় না। আবার যাদের প্রভাব বেশি কিংবা অনুসারী বেশি, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম ভাঙলেও শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার উদাহরণ মিলেছে। ফলে ন্যায়সংগত পরিবেশ তৈরি হয় না।
স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত ভুল তথ্য থামাতে ব্যর্থতা
খাওয়াদাওয়ার অনিয়ম, গর্ভপাত বা গর্ভাবস্থার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুকের ডিসইনফরমেশন নীতিমালা বাস্তবে এসব গুজব থামাতে কার্যকর হতে পারে না। এতে ব্যবহারকারীর সিদ্ধান্তে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে।
রিপোর্টিংয়ের বোঝা সব ভুক্তভোগীর কাঁধে
হয়রানির শিকার ব্যক্তিকে প্রতিটি পোস্ট ও প্রতিটি ইউজার আলাদা করে রিপোর্ট করতে হয়। এটা সময়সাপেক্ষ এবং মানসিকভাবে ক্লান্তিকর। অনেক প্ল্যাটফর্মে যে কেউ নীতিবিরুদ্ধ কন্টেন্ট রিপোর্ট করতে পারে, কিন্তু ফেসবুকে এই সীমাবদ্ধতা ভুক্তভোগীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
রয়েছে উগ্রপন্থার ফাঁদ, কিন্তু সহায়তা নেই
ফেসবুকের এলগরিদম মাঝে মাঝেই ব্যবহারকারীদের চরমপন্থী গ্রুপ বা ঘৃণামূলক কনটেন্টের দিকে ঠেলে দেয়। অথচ গুজব, উগ্রপন্থা বা ঘৃণা চিনে ফেলার জন্য কোনো সহজ রিসোর্স বা সতর্কতামূলক গাইডলাইন দেখায় না। নতুন বা কিশোর ব্যবহারকারীদের জন্য বিষয়টি আরও ঝুঁকিপূর্ণ।
কনটেন্ট মুছলে আপিলের সুযোগ দরকার
কোনো কনটেন্ট মুছে দিলে ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভুলভাবে সরানো কনটেন্ট ফেরত পেতে একটি স্বচ্ছ আপিল–প্রক্রিয়া থাকা জরুরি। এতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় এবং প্ল্যাটফর্মের ওপর আস্থা বাড়ে।
ইনস্টাগ্রাম: আলাদা প্ল্যাটফর্ম, ভিন্ন সংকট
ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক একই কোম্পানির হলেও প্ল্যাটফর্মের স্বভাব, ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ও উপস্থাপনা ভিন্ন। ছবিভিত্তিক ও ভিডিও–কেন্দ্রিক এই প্ল্যাটফর্মে নারীবিদ্বেষী অ্যালগরিদমিক ধারা, বডি–শেমিং, লিঙ্গবৈষম্যমূলক ফিল্টারের মতো সমস্যা বেশি চোখে পড়ে। তাই ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যাণ্ডার্ড কপি–পেস্ট করলেই চলে না; ইনস্টাগ্রামের জন্যে চাই আলাদা, সংবেদনশীল নীতিমালা।
ইনস্টাগ্রামের জন্য কীভাবে আলাদা নীতিমালা হওয়া উচিত
ইনস্টাগ্রামের ভিজ্যুয়ালকেন্দ্রিক কাঠামোতে দেহ–ছবির চাপ, মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, এবং জাতি–লিঙ্গ পরিচয়–শারীরিক ভিন্নতা নিয়ে বৈষম্য বেশি স্পষ্ট হয়। নীতিমালায় এসব ঝুঁকিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে হবে, কনটেন্ট মডারেশন ও অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তে বৈষম্য না ঘটে তা নিশ্চিত করতে হবে, এবং ক্ষতিকর ট্রেন্ড বা ফিল্টার দ্রুত চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিরাপদ ইন্টারনেট সবার অধিকার
সামাজিক মাধ্যমকে সত্যিকার অর্থে নারীবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে নিয়ম শুধু কাগজে থাকলেই হবে না; কঠোর ও ন্যায়সঙ্গত প্রয়োগ, ভুক্তভোগীবান্ধব রিপোর্টিং, ভুয়া তথ্য দমনে কার্যকর ব্যবস্থা, স্বচ্ছ আপিল প্রক্রিয়া এবং ইনস্টাগ্রামের জন্য আলাদা নীতিমালা; এসব জরুরি বিষয়ে একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া দরকার। নিরাপদ ইন্টারনেট সবার অধিকার; সেই লক্ষ্যেই প্ল্যাটফর্ম, নীতিনির্ধারক ও ব্যবহারকারী—সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে।